যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তির পথে কেন বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন নেতানিয়াহু
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি বা সমঝোতার পথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu কেন বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন—এই প্রশ্ন এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। বিষয়টি বুঝতে হলে ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্ব, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল এবং নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বাস্তবতা—সব একসাথে দেখতে হবে।
কেন ইরান নিয়ে এত উত্তেজনা?
ইরান বহু বছর ধরে পারমাণবিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অভিযোগ করে, তেহরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ইরান অবশ্য বলে, তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ জ্বালানি ও গবেষণার জন্য।
ইসরায়েলের কাছে ইরান শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং “অস্তিত্বগত হুমকি”। কারণ—
- ইরান প্রকাশ্যে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নেয়
- Hezbollah ও অন্যান্য আঞ্চলিক গোষ্ঠীকে সমর্থন দেয়
- সিরিয়া, লেবানন, গাজা ও ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বাড়ছে
- ইরান পারমাণবিক শক্তিধর হলে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে
এই কারণেই নেতানিয়াহু বরাবরই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
নেতানিয়াহু কেন শান্তিচুক্তি পছন্দ করেন না?
১. ইরানকে তিনি দীর্ঘমেয়াদি হুমকি মনে করেন
নেতানিয়াহুর বিশ্বাস, ইরানের সঙ্গে কোনো নরম সমঝোতা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ তৈরি করবে। তিনি মনে করেন, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হবে এবং আবার সামরিক সক্ষমতা বাড়াবে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানকে শুধু আলোচনায় নয়—সামরিক ও কৌশলগত চাপের মাধ্যমে দুর্বল করতে হবে।
২. নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও জড়িত
বিভিন্ন বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকার সঙ্গেও ইরান ইস্যু গভীরভাবে যুক্ত। ইসরায়েলের অভ্যন্তরে দুর্নীতির মামলা, জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং জোট সরকারের সংকট—এসবের মধ্যে “নিরাপত্তা সংকট” তাকে রাজনৈতিক সুবিধা দেয়।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যুদ্ধ বা উত্তেজনা চলতে থাকলে তিনি নিজেকে “ইসরায়েলের রক্ষাকর্তা” হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।
৩. যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা হলে ইসরায়েলের প্রভাব কমতে পারে
যদি ওয়াশিংটন ও তেহরান সরাসরি সমঝোতায় পৌঁছে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের কৌশলগত গুরুত্ব কিছুটা কমে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র তখন সরাসরি ইরানের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি নিয়ে কাজ করতে চাইবে। এটিও নেতানিয়াহুর জন্য অস্বস্তিকর।
৪. নেতানিয়াহু “রেজিম চেঞ্জ” ধারণায় বিশ্বাসী
সাম্প্রতিক বক্তব্যে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ইরানের বর্তমান সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং পরিবর্তন আসতে পারে।
অর্থাৎ, তিনি শুধু চুক্তি নয়—ইরানের বর্তমান ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতনকেই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?
Donald Trump প্রশাসন একদিকে ইরানের ওপর চাপ বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে বড় আকারের যুদ্ধ এড়াতেও আগ্রহী। কারণ—
- তেলের বাজার অস্থির হয়ে যায়
- হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ যুদ্ধ আমেরিকার জন্য ব্যয়বহুল
- মার্কিন জনগণের মধ্যেও যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ছে
তাই ওয়াশিংটন মাঝে মাঝে “চাপ + আলোচনা”—এই দুই পথ একসাথে ব্যবহার করছে।
ইরানের অবস্থান
Iran বলছে, তারা আলোচনায় রাজি, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে হবে এবং ইসরায়েলের সামরিক হামলা বন্ধ করতে হবে। ইরানের অভিযোগ—যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে আলোচনা করলেও, বাস্তবে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিয়ে চাপ বাড়াচ্ছে।
তাহলে শান্তিচুক্তি কেন কঠিন?
কারণ এখানে শুধু দুই দেশের বিরোধ নয়; বরং চারটি বড় বিষয় জড়িত—
- পারমাণবিক কর্মসূচি
- মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার
- ইসরায়েলের নিরাপত্তা
- নেতাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থ
নেতানিয়াহু মনে করেন, ইরানের সঙ্গে আপস ভবিষ্যতে ইসরায়েলের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ যুদ্ধেও যেতে চায় না। আর ইরানও চাপে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়।
ফলে শান্তিচুক্তির আলোচনা যতই এগোক, আঞ্চলিক উত্তেজনা, সামরিক হামলা এবং রাজনৈতিক অবিশ্বাস সেই পথকে বারবার কঠিন করে তুলছে।

0 Comments